
মাদক কারবারিদের হাত কতটা নিষ্ঠুর ও ভয়ংকর হলে একটি শিশুর নিষ্পাপ শরীরকেও তারা মাদক পরিবহনের বাহন হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, তা আবারও স্পষ্ট হলো চট্টগ্রামের আনোয়ারায় দুই শিশুর পাকস্থলী থেকে ৬ হাজার ৬১৫টি ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায়। ৯ ও ১২ বছর বয়সী ওই দুই শিশুকে কক্সবাজারের উখিয়া থেকে চট্টগ্রামে আনা হচ্ছিল। পরিবারের খরচ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের ৮ হাজার টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়েছিল। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, এর আগেও অন্তত তিন দফা তাদের দিয়ে ইয়াবা পরিবহন করা হয়েছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে।
এই ঘটনাকে কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি মাদক কারবারিদের নতুন কৌশল এবং শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্বলতার ইঙ্গিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সন্দেহ এড়াতে শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে। কখনও তাদের দিয়ে ছোট চালান বহন করানো হচ্ছে, আবার কখনও পাকস্থলীতে মাদকের প্যাকেট ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি প্রাপ্তবয়স্ক নারীর সঙ্গে ছোট শিশুকে রেখে স্বাভাবিক যাত্রার আড়ালেও মাদক পরিবহন করা হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, শিশুদের এই কাজে যুক্ত করা হচ্ছে মূলত তাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে। দরিদ্র পরিবার, পথশিশু, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন কিশোর কিংবা রোহিঙ্গা শিবিরের ঝুঁকিতে থাকা শিশুরা মাদক কারবারিদের সহজ টার্গেটে পরিণত হচ্ছে। সামান্য অর্থের বিনিময়ে তাদের এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পাঠানো হচ্ছে, যেখানে একটি প্যাকেট ছিঁড়ে গেলেই মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। অর্থাৎ মুনাফার জন্য অপরাধীরা শিশুদের জীবনকেই জুয়া হিসেবে ব্যবহার করছে।
শিশুদের পাকস্থলীতে ইয়াবা বহনের বিষয়টি শুধু মাদকবিরোধী অভিযানের প্রশ্ন নয়; এটি সরাসরি শিশু নির্যাতন, শোষণ ও মানবাধিকারের প্রশ্ন। ফলে শুধু যে শিশুটিকে উদ্ধার বা আটক করা হলো, তাকে কেন্দ্র করে তদন্ত সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তাকে কে ব্যবহার করেছে, কার নির্দেশে করেছে, অর্থের উৎস কোথায়, কোথায় মাদক পৌঁছানোর কথা ছিল এবং পুরো চক্রের সঙ্গে কারা জড়িত সবকিছু বের করতে হবে। মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা ছাড়া এ ধরনের অপরাধ বন্ধ হবে না। এ ক্ষেত্রে সীমান্ত ও পরিবহনপথে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি শিশু সুরক্ষার ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা জরুরি। ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের তালিকা তৈরি, স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশুদের শনাক্তকরণ, পরিবারকে আর্থিক ও সামাজিক সহায়তা এবং শিশুদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে সুরক্ষা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকল্যাণ সংস্থার মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
মাদক নির্মূলে অভিযান অবশ্যই চলবে। কিন্তু অভিযানের সাফল্য শুধু কতটি ইয়াবা উদ্ধার হলো বা কতজন গ্রেপ্তার হলো, তা দিয়ে মাপলে চলবে না। দেখতে হবে, নতুন করে কত শিশু এই অন্ধকার জগতে ঢুকে পড়া থেকে রক্ষা পেল। কারণ একটি শিশুকে মাদক বহনের হাত থেকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি অপরাধ ঠেকানো নয়; একটি জীবন, একটি পরিবার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা।
মাদক কারবারিদের কাছে শিশুরা যদি নিরাপদ বাহনে পরিণত হয়, তবে তা আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থার জন্য গভীর সতর্কবার্তা। এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ইয়াবার বিস্তার যেমন বাড়বে, তেমনি অপরাধচক্রের হাতে শিশুদের শোষণের পরিধিও আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।